মানুষ ভূপৃষ্ঠের কত গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে?

 মানুষ ভূপৃষ্ঠের কত গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে?



আপনি কি কখনো ভেবেছেন যদি পৃথিবীর মাঝ বরাবর গর্ত করা যায় তাহলে সেটি পৃথিবীর অপর পাশের কোন স্থানে বের হবে? ধরে নিলাম, বিজ্ঞানীদের কাছে এমন একটি যন্ত্র রয়েছে। যা দিয়ে আমরা ইন্ডিয়া বা পাকিস্তানের মাটিতে গর্ত করলাম। যা এত গভীর যে সেটি পৃথিবীর অপর পাশে বের হয়। আপনারা জেনে অবাক হবেন, সেই গর্তটি আর্জেন্টিনা বা মেক্সিকোর কাছের সমুদ্রের মধ্যে বের হবে। এর দূরত্ব প্রায় ১২৭৪০ কিলোমিটার।


আমাদের মাথায় কখনো না কখনো চিন্তা আসে, যদি আমরা মানুষেরা সাড়ে ৫ কোটি কিলোমিটার দূরের মঙ্গলগ্রহে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারি। তাহলে আমরা কেন ১২৭৪০ কিলোমিটার লম্বা গর্ত করতে পারি না? আজকে আপনারা এই ভিডিও এর মাধ্যমে জানতে পারবেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ মাটির কত গভীর পর্যন্ত গর্ত করতে পেরেছে। মাটির ভিতরে কোন জিনিস রয়েছে, যেটি বড় বড় গর্ত করার মেশিন নষ্ট করে দেয়।


মাটির উপরের স্তর থেকে ৬ ফুট গভীর পর্যন্ত সাধারণত কবর খুঁড়া হয়। এর আরো ১৩ ফুট গভীরে ইজিপ্ট এর ৩ হাজার পুরনো রাজা টুটোন খাবুন এর মমি এবং তার গুপ্তধন পাওয়া যায়। এর আরো ২০ ফুট নিচে মেটেল ডিটেক্টর মাটির নিচের লোহা অনুসন্ধান করতে পারে। এর আরো ৪০ ফুট নিচে নাইল কুমির তার বাসা তৈরি করতে পারে। এটি যে কোন প্রাণিদের বাসস্থানের মধ্যে সবচেয়ে গভীর বাসস্থান।


৬৫ ফুট গভীরতায় ফারাস এর শহর বেরিচ এর নিচে প্যারিস কেটাগুল রয়েছে। এখানে অনেক বছর আগে ৬০ লক্ষ মানুষ কে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল। এই জায়গা কে মানুষ নরক এর দরজা বলে আর এর ভিতরে যাওয়া বে-আইনি। 


৭০ ফুট গভীরতায় দুনিয়ার সবচেয়ে গভীর সুইমিংপুল তৈরি করা হয়েছিল। এই সুইমিংপুল দুবাই এ ডিপ ড্রাইভ নামে জনপ্রিয়। এখানে মোট দেড় কোটি লিটার জল আছে। মাটির নিচে ৩২৮ ফুট গভীরতায় নিউক্লিয়ার ওয়েস্ট পুঁতে ফেলা হয়। আরো একটু গভীরতায় ৩৬৫ ফুট এ পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর মেট্রো স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। এই মেট্রো স্টেশন ইউক্রেন এর ক্রিভ শহরে তৈরি করা হয়েছে। এখানে পৌঁছানোর জন্য অনেক গুলো লিফট এর ব্যবহার করা হয়।


৪০০ ফুট গভীরতায় গাছের শিকড় পৌঁছাতে পারে। এত বড় শিকড় সাউথ আফ্রিকায় একটি ফিগ ট্রি তে দেখা গিয়েছে। এই জায়গায় নিচে অর্থাৎ ৭০০ ফুট গভীরতায় পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর নদীর অনুসন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এই নদী আফ্রিকায় অবস্থিত এবং এর নাম কংগো নদী। অবাক করার বিষয় মানুষ এর চেয়ে বেশি নিচে গিয়েছে।


৭০০ ফুট গভীরে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর রেল লাইন অবস্থিত। এই রেল লাইন জাপানে সাইকেন ট্রানেল নামে পরিচিত। এটি জাপানের দুইটি দ্বীপ কে সংযুক্ত করে। এই ট্রানেল সমুদ্রের নিচে তৈরি করা হয়েছে। ৯৪০ ফুট গভীরতায় পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। এটি নরওয়ে তে ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে এই রেকর্ড ভেঙ্গে দেওয়া হয়। এই ট্রানেল এর ১৮ ফুট নিচে রোগাল্যান্ড এ রাইফ্রাস্ট ট্রানেল তৈরি করা হয়েছে। এটি এখন মাটির ৯৫৮ ফুট গভীরতায় অবস্থিত।


বিজ্ঞানীদের মতে, মাটির ১ হাজার ফুট নিচে কেউ লুকিয়ে থাকলে, সে নিউক্লিয়ার মিসাইল থেকে বাঁচতে পারবে না। বি এইট্রি টু নিউক্লিয়ার ওয়ারহ্যাড নামের এই নিউক্লিয়ার মিসাইল কোথাও পরলে মাটির ১ হাজার ফুট নিচে পর্যন্ত ধ্বংস করতে পারে।


আরো নিচে ১২৮৬ গভীরতায় পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর জলের কোয়া অবস্থিত। এই কোয়া হাতের সাহায্যে খনন করা হয়েছিল। এটি ইংল্যান্ড এ অবস্থিত ওডিং ডিন এ একটি হাসপাতালের বাহিরে অবস্থিত। এটি ১৮৬২ সালে ৪ সাল পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল এবং এখান থেকে রোগীদের জন্য জল নেওয়া হতো।


১৯৮০ ফুট গভীরতায় পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ভার্টিকেল গুহা রয়েছে। সেলেভিনিয়ায় এই ভার্টিকেল গুহাটি অবস্থিত। দুর্ভাগ্যবশত কেউ এই গুহায় পরে গেলে সেটি চায়নার সাংগাই টাওয়ার থেকে লাফ দেওয়ার মতো হবে। আরো নিচে ২৩০০ ফুট গভীরতায় চিলির ৩৩ খনন কর্মী খাবার এবং জল ছাড়া ৬৯ দিন আটকা পরে ছিল। ইউটিউব এ সার্চ করে তারা কিভাবে এখান থেকে বের করা হয়েছে সেটি জানতে পারবেন।


মাটির ৩১৮০ ফুট গভীরতায় মানুষের খনন করা এমন একটি গর্ত রয়েছে, যেখান থেকে খোলা আকাশ দেখতে পাওয়া যায়। এই জায়গা কে বিংহাম কোপার মাইন'স বলা হয়। এটি এত গভীর যে এখানে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর বিল্ডিং প্রবেশ করে যাবে এবং তারপরেও অনেক জায়গা অবশিষ্ট থেকে যাবে। মানুষ মাটির এর চেয়ে বেশি নিচে গিয়ে এই রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে।


৫৩৮৭ ফুট নিচে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর লেক এর অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। এই লেক রাশিয়ায় বাইকাল নামে পরিচিত। আরো নিচে ৬০০০ ফুট গভীরতায় গ্রান্ড কেনিয়াম এর অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। মাটির এত গভীরে মানুষ গিয়েছে। কানাডার সার্থবারি শহরে ৬২৩৮ ফুট গভীরে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর মিউজিক কন্সার্ট হয়েছিল। ৮ মার্চ ২০২০ তারিখে সার্ফ বটম বয়েস ক্রিটেন মাইন এ গিয়ে এই কন্সার্ট করেছিল।


পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর খাদ এরচেয়ে আরো নিচে। ৭২০০ ফুট নিচে এই গুহা জুরজিয়ায় অবস্থিত। অবাক করার বিষয় হলোঃ মানুষ এরচেয়ে বেশি নিচে যেতে সফল হয়ে গিয়েছে। ১০৩০০ ফুট গভীরে আফ্রিকায় মুয়াব কর্টসং মাইনসিফট এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই জায়গায় পৌঁছানোর জন্য একটি লিফট এর সাহায্য নিতে হয়। এই লিফট মাইন এর নিচে পৌঁছাতে সাড়ে ৪ মিনিট সময় নেয়। এটি এত গভীর যে যদি কেউ এর ভিতরে পরে যায়। তাহলে সে বাতাসে ২৫ সেকেন্ড পর্যন্ত থাকবে।


আরো একটু নিচে গেলে অর্থাৎ ১৩১২০ ফুট গভীরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গোল্ড মাইন রয়েছে। এই গোল্ড মাইন আফ্রিকায় অবস্থিত। এর ভিতরে যেতে কর্মীদের ১ ঘন্টা সময় লাগে। এই মাইন এর নিচের তাপমাত্রা ৬৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এই জায়গার আরো অনেক নিচে অর্থাৎ ২৯০০০ ফুট গভীরতা মাউন্ড এভারেস্ট এর উচ্চতার সমান। ৩৮৩০০ ফুট গভীরতা কমার্শিয়াল ফ্লাইট উঁড়ার উচ্চতার সমান।


আপনি বিশ্বাস করবেন না। তবে মানুষ মাটিতে এরচেয়ে বেশি গভীরতায় গর্ত করেছে। ৪০২৩০ ফুট নিচে মানুষের তৈরি সবচেয়ে গভীর গর্ত রয়েছে। এটি কোলা সুপারডিপ বোর হোল নামে পরিচিত। এটি ২৩ মিটার চড়া গর্ত। ১৯৭৯ সালে রাশিয়া বানিয়ছিল। তাদের লক্ষ ছিল পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত পৌঁছানো। কিন্তু ৯ বছরের কঠোর পরিশ্রমের পরে এমন একটি সময় আসে, যখন নিচের তাপমাত্রা ১৮০ ডিগ্রী সেলসিয়াস এ পৌঁছে যায়। তখন খনন যন্ত্রপাতি এত বেশি গরম হয়ে যেত যে তাদের পক্ষে নিচে খনন করা সম্ভব ছিল না। এই গর্তে কোন বল ছুঁড়ে মারা হলে সেটি নিচে পৌঁছাতে ৫০ সেকেন্ড সময় লাগবে।


কিন্তু অবাক করার বিষয় মানুষ তার তৈরি এই রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। ২০০৮ সালে কাতার এর একটি তেল কোম্পানি ৪০,৩১৮ ফুট গভীর গর্ত তৈরি করে পৃথিবীর সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। এটি হলো আল সাহিন ওয়েল ফিল্ড এবং এটি সেই জায়গা যেখানের মাটির নিচে সবচেয়ে গভীর গর্ত করা হয়েছে। এই রেকর্ড এখনো কেউ ভাঙ্গতে পারে নি।


যদি এর গভীরতা অনুমান করতে হয় তাহলে এর গভীরতা আকাশের এই উচ্চতার সমান। আমাদের পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু ৬৩৭১ কিলোমিটার নিচে। এই পর্যন্ত আমরা মানুষেরা মাত্র ১২ কিলোমিটার গভীরে গর্ত করতে পেরেছি। ধরুন, দুবাই পৃথিবীর উপরের মাটির স্তর। এখান থেকে ৬৩৭১ কিলোমিটার দূরে কোরিয়া পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু। আমরা মানুষেরা এই পর্যন্ত এত টুকু গভীর করতে পেরেছি যতটা আপনারা দেখতে পারছেন।

মন্তব্যসমূহ